নারায়নগঞ্জ প্রতিনিধিঃ উচ্ছলা, চঞ্চলা উজ্জল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনা এক যুবতি হাফছারাজ ইশারা। ধর্মান্ধতা আর কু-সংস্কারের যাতাকলে নিষ্পেষিত এই যুবতি আজ সর্বহারা। হিন্দু যুবককে ভালবেসে বিয়ে করার অপরাধে পরিবার, আত্মীয় স্বজন থেকে বঞ্চিত সমাজে কলংকিনী, চরিত্রহীনা আর অস্পৃশ্য আখ্যা পেয়ে পথে পথে স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে অবশেষে অর্থব্য সমাজের কাছে আত্ম সমর্পন করে গভীর চাঁপা বেদনা হৃদয়ে ধারন করে ছুটে চলা অসহায় তরুনী। হাফছা রাজ ইশারা এক সম্ভাবনাময় মেধাবী যুবতি। নারায়নগঞ্জ জেলার নারায়নগঞ্জ সদর থানার ২২৬নং দেওভোগ পাককা রোড নিবাসী এই অসহায় তরুনীর পিতার নাম জিয়া উদ্দিন রুমেল, মাতা-সাজেদা খাতুন। তার পিতা-একজন থান কাপড়ের ব্যবসায়ী কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে জিয়া উদ্দিন রুমেল ধর্ম ভিত্তিক সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় কর্মী।
বয়োসন্ধিক্ষনে হাফছা রাজ ইশারার পিতা তাকে স্থানীয় বালিকা মাদ্রাসায় ভর্তির জন্য চাপ দেন। হাফছা রাজ শৈশব হতেই একটু স্বেচ্ছাচারী, স্বাধীন চেতা যুবতি তাই তার মাতার কাছে ইংরেজী মিডিয়াম স্কুলে বায়না ধরে সে। মায়ের সমর্থনে ভর্তি হয় নারায়নগঞ্জ এ. বি. সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। সাবালিকা হবার পর কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন মানতে বাধ্য হতে অনীহা জানালে পিতার সাথে ইশারার অনেকবার দ্বন্দ হয়। ২০২১ সালে O LEVEL এবং ২০২৩ সালে শেষ করে A- LEVEL এ ভর্তি হয় হাফসা রাজ ইশারা। সহপাঠীদের সান্নিধ্য আর সংস্পর্শে এসে সে ক্রমশ প্রগতিশীল, আধুনিক, ধর্মান্ধতা বিরোধী হয়ে সামপ্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী হয়ে উঠে। একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র রাজন কুমার ঘোষ এর সাথে হাফছা রাজ ইশারার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। এক পর্যায়ে এই বন্ধুত্ব ভালবাসায় রূপ নেয়। বিভিন্ন ভাবে তারা একান্তে ঘনিষ্ট হয়।
হাফছা রাজ ইশারার পিতা তার চলাফেরায় সন্তুষ্ট না হয়ে দ্রুত তাকে বিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। ইশারার প্রেমিক রাজন কুমার ঘোষ নারায়নগঞ্জে কলেজে ভর্তি হয় এবং তৎকালীন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগে যোগদান করে। এরই মাঝে হাফছা রাজ ইশারার পিতা জিয়া উদ্দিন রুমেল স্থানীয় ইসলামী ছাত্র শিবিরের এক নেতার সাথে বিবাহ ঠিক করেন কিন্তু পিতা নির্ধারিত ছেলেকে বিবাহ বারতে ইশারা অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় পারিবারিক দ্বন্দ। এক পর্যায়ে হাফছা রাজ ইশারা তার ভালবাসার কথা জানায়। তার পিতা খোজ নিয়ে জানতে পারেন হাফছার বর্নিত প্রেমিক এক হিন্দু ধর্মালম্বী ও ছাত্রলীগ সদস্য। তিনি অতিশয় ক্ষিপ্ত হয়ে বাড়ী গিয়ে হাফছা রাজ ইশারাকে বেধড়ক মারপিট করেন। ইশারা অজ্ঞান হয়ে গেলে তার মাতা সাজেদা বেগম বাসায় ডাক্তার এনে চিকিৎসা করান। হাফছা রাজ ইশারাকে গৃহবন্দী করে রাখাহয়।
বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে হাফছা রাজ ইশারার প্রেমিক রাজন কুমার ঘোষ সব জানতে পারে। দুজন পরামর্শ করে কিছুদিন পর গভীর রাতে পালিয়ে হাফছা রাজ ইশারা তার প্রেমিকের কাছে চলে যায়। কিন্তু রাজনের পরিবার মুসলিম যুবতি কে গ্রহন করতে অস্বীকার করায় রাজন কুমার পরিবারের সাথে ঝগড়া করে তার প্রেমিকাকে নিয়ে নারায়নগঞ্জের প্রখাত আওয়ামীলীগ নেতা ও সাংসদ জনাব শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আওয়ামীলীগ নেতা আবু হাসনাত শহীদ বাদলের ভাড়া বাসায় উটে তারা তার পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়। উক্ত নেতা তাদেরকে আশ্রয় দিয়ে কোর্টের মাধ্যমে বিবাহ সংক্রান্ত হলফনামা করিয়ে দেন। তারা দাম্পত্য জীবন শুরু করে।
বিগত ০৫ই আগস্ট/২০২৪ ইং সালে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কারনে দোর্দন্ড প্রতাপ শালী আওয়ামীলীগ সরকারের পতন হলে ঐদিন সন্ধ্যার পর সারা বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতা কর্মীরা সমগ্র বাংলাদেশে আওয়ামীলীগ নেতাদের হত্যা, বাসায় আগ্নি সংযোগ, ভাংচুর সহ থানায় আক্রমন করে পুলিশ হত্যা শুরু করে। হামলা হয় আবু হাসনাত শহীদ বাদলের বাসায়। সন্ত্রাসীরা আক্রমনের পর তার স্ত্রী সন্তানের সাথে রাজন কুমার ঘোষ ও হাফছা রাজ ইশারাত আক্রান্ত হন। ইশারা গর্ভবতী ছিল। মারপিটের কারনে তার গর্ভপাতের লক্ষন শুরু হয়।
অন্যদিকে তার স্বামী রাজন কুমার ঘোষকে সন্ত্রাসীরা মারাত্মক আহত করে। বদলের পরিবারের সাথে ইশারা অন্যত্র পালিয়ে গেলে তার স্বামী রাজন অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকেন। এরই মধ্যে হাফছা রাজ ইশারাকে হাসপাতালেন ভর্তি করা হয়। পরদিন কিছু সহৃদয় ব্যক্তি রাজন কুমার ঘোষকে একই হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাফছা রাজ ইশারা কিছুটা সুস্থ হয়ে স্বামীর সন্ধান পান। অচেতন থাকায় রাজনের পরিবারকে জানালে দ্রুত রাজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও পরে ঢাকা নিউরোসাইন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘ দিন কোমায় থেকে রাজন কমার ঘোষ মারা যান।
ইতিপূর্বে হাফছাকে তার পিত্য সম্পর্ক ছিন্ন করে উকিল নোটিশ দেন। আবু হাসনাত শহীদ বাদল গোপনে ভারত চলে যান। হাফছা রাজের আর কোন বাসস্থান না থাকায় তিনি বদল সাহেবের স্ত্রীর নিকট আশ্রয় পান। স্বামী হত্যার বিচারের জন্য থানা, লিগ্যাল এইড সহ বিভিন্ন সংস্থার আশ্রয় নিলেও কেউ তাকে সাহায্য করেনি। এক পর্যায়ে এই প্রতিবেদকের সাথে তার জীবন কাহিনী বলেন।
সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নারায়নগঞ্জ প্রতিনিধি দেওভোগ পাকা রোড, রাজনের গ্রামের বাড়ী সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে কথা বলে সকল সত্যতা অনুসন্ধানী কার্যক্রমে উঠে আসে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইশারার তথ্য পাওয়া যায়নি।
থানার ওসি ও লিগ্যাল এইডের আইনজীবী জানান, এরকম একটি অভিযোগ পেলেও কোন প্রমান না থাকায় তারা সহযোগীতায় ব্যর্থ হন। ইশারা আজ পরাজিত ধর্ম, সমাজ আর অপরাজনীতির কারণে। এমন করে মেধাবী হাফছা রাজ ইশারার মত আর কত মানুষ নিঃস্ব হবে আর এর জন্য দায়ী কে?এই প্রশ্ন আজ সচেতন সমাজের কাছে।